fbpx

ইলম অর্জনের পথ

মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ

দুনিয়াতে এই ইলম যখন থেকে আছে তখন থেকে ওয়াজ ও নসীহতের মজলিস হয়ে আসছে। আম্বিয়ায়ে কেরাম মানুষকে খেতাব করতেন। কাফিরকেও করতেন। মুমিনকেও করতেন, মুমিনরা আম্বিয়ায়ে কেরামের কথা শুনত এবং ফায়দা হাসিল করত। পক্ষান্তরে কাফিররা শুনত, কিন্তু মাহরূম হত। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিরদেরকে যেমন খেতাব করেছেন, তেমনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মজলিসে মুমিনদেরকে, সাহাবা কেরামকে খেতাব করেছেন।

আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্য তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইছমত আছে। তাঁদের কখনো রিয়া হত না। পূর্ণ ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের কারণে ঈমানদারদের উপকার হত। সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে তাবেয়ীন শুনতেন। সাহাবায়ে কেরাম যেহেতু ‘রাযিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাযূ আনহু’ এজন্য তাঁদের কথা দ্বারা সামিয়ীনের কোনো ক্ষতি হত না। খায়রুল কুরূনের পর এখনও যেহেতু দ্বীন আছে এবং দ্বীনের উপর আমলের ধারাও ইনশাআল্লাহ থাকবে, এজন্য কিছু মানুষকে কথা বলতে হবে। আর অনেক মানুষকে সে কথা শুনতেও হবে।

যারা শোনে তাদের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। শোনার দ্বারা রিয়া পয়দা হয় না। তাই যারা শোনে তারা সাধারণত লাভবানই হয়। কিন্তু যারা বলে তাদের যেমন লাভের সম্ভাবনা থাকে তেমনি ক্ষতিরও বিরাট আশঙ্কা থাকে। কারণ শয়তান তাদের দিলে বিভিন্ন হালত পয়দা করে দিতে পারে। রিয়া আসতে পারে, শোহরতের নিয়ত আসতে পারে। যারা লেখে তাদের দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। কোনো বই পড়ে কারো মধ্যে রিয়া আসে না। কিন্তু বই লিখে রিয়া আসার আশঙ্কা থাকে। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার একটা লোভ শয়তান জাগিয়ে দেয়। আমরা সবাই জানি যে, দুনিয়ার যিন্দেগী কিছুই নয়। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাবে। আখিরাতের অনন্ত যিন্দেগী শুরু হবে। তো দুনিয়ার শোহরত, মানুষের তারীফ-এগুলি কিছুই নয়।

তো যারা লেখে এবং বলে তারা ‘আলা খতরিন আজীম’-বিরাট খতরার মধ্যে আছে। এজন্য যারা কারো লেখা পড়ে কিংবা কথা শুনে উপকৃত হয় তাদের কর্তব্য, ঐ লেখকের জন্য, ওয়ায়েজের জন্য দুআ করা-হে আল্লাহ! তার লেখা দ্বারা, তার কথা দ্বারা আমরা উপকৃত হচ্ছি, তুমি তাকে রিয়া থেকে, নফস ও শয়তানের ফেতনা থেকে এবং তোমার নাফরমানী থেকে হেফাযত কর। এটা পাঠক ও শ্রোতার উপর লেখক ও ওয়ায়েজের একটি হক। বহু পাঠক ও শ্রোতা-আলহামদুলিল্লাহ-এই হক আদায় করে থাকে। আমি তোমাদেরকে এই কথাগুলি বলছি আমার নিজের ফায়েদার জন্য। কারণ এ মজলিসে আমি যে কথাগুলো বলার নিয়ত করেছি, ভয় হয়, ঐ কথাগুলো দ্বারা তোমরা উপকৃত হলে, অথচ আমি মাহরূম হয়ে গেলাম। আল্লাহ হেফাযত করুন।

প্রতিটা কথা দ্বারা তোমরা যেমন উপকৃত হবে, আল্লাহ যেন আমাকেও উপকৃত করেন। আমীন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর ওমর রা. বললেন, এখন নিজেদেরকে এত অসহায় মনে হচ্ছে যে, আল্লাহর কাছে এখন আর লাভ চাই না। এই যিন্দেগীটা যদি গুনাহ থেকে আল্লাহ হেফাযত করেন তাহলেই নিজেদেরকে আমরা কামিয়াব মনে করব।

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা, উম্মতের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির অনুভূতি হল এই। তো লাভ আল্লাহ যদি মেহেরবানি করে দেন আলহামদুলিল্লাহ-তবে লোকসান থেকে যেন সবাই বেঁচে থাকতে পারি। আল্লাহ যেন আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য বলবার  এবং আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য শুনবার তাওফীক দান করেন। আমীন।

আমরা যারা পড়াই (উস্তাদ), আমাদের সবার জন্য দুআ কর। আমার নিজের মধ্যেও দেখি, অনেক সময় কোনো একটা ভালো কথা দরসে বলতে পারলে, ভিতরে একটা …। এটা যদি শোকরের কারণে হয় তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি উজব, আত্মপ্রসাদ ও আত্মপ্রশংসার অনুভূতি থেকে আসে, তাহলে তো বরবাদি ছাড়া আর কিছুই নেই।

তালিবানে ইলমেরও কর্তব্য হল দুআ করা যে, হে আল্লাহ! যাদের দ্বারা আমরা উপকৃত হচ্ছি, যাদের দ্বারা ইলম হাসিল করছি, তাদেরকে তুমি হেফাযত কর। দুআ করলে তালিবে ইলমের নিজেরই ফায়দা। আল্লাহ তাআলা তাকে ‘দিন দোগনী রাত চোগনী’ তরক্কী দান করতে থাকবেন।

কথার তো দিলের মধ্যে মওজ অনেক। কোনটা যে বলব, কোনটা যে বলব না বুঝে উঠতে পারি না। সবই জরুরি কথা। সবই মূল্যবান কথা। এত মূল্যবান যে, একটা কথার উপরও যদি মানুষ আমল করে তাহলে তার যিন্দেগী কামিয়াব হওয়ার জন্য, সুন্দর হওয়ার জন্য, জান্নাতের উপযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অনেক কথার মধ্যে বেছে এখন শুধু একটি কথা বলি।

‘মানুষ নিজের লাভ চায় এবং ক্ষতি থেকে বাঁচতে চায়’-এর চেয়ে বড় সত্য কথা দুনিয়াতে আর কী আছে? কিন্তু সমস্যা হল, লাভের ক্ষেত্র কী, আর ক্ষতির ক্ষেত্র কী তা নির্ধারণ করা। একজন যে নাফরমানী করছে, আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘণ করছে, লাভ মনে করেই করছে। সে ভাবে আমি এই ভাবে লাভবান হব। যে অন্যের মাল ছিনিয়ে নেয় সেও নিজের লাভ সন্ধান করে আর যে কুড়িয়ে পাওয়া মাল ফিরিয়ে দেয় সে-ও লাভ মনে করেই দেয়। আগে একটি ঘটনা পড়েছি। আল্লামা তবারী রাহ. উদ্ধৃতি দিয়ে ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। লম্বা ঘটনা। এখন পুরোটা বলব না, মুখতাসার বলে অন্যদিকে যাব। আল্লাহ তাআলা যদি তাওফীক দেন তাহলে পরে কখনো বলব। এক বুযুর্গ। ছিয়াশি বছর বয়স, নিজে ক্ষুধার্ত, ষাট বছর বয়সের স্ত্রী ক্ষুধার্ত, সন্তান-সন্ততি ক্ষুধার্ত। আর একদিনের ক্ষুধার্ত নন, কয়েকদিনের ক্ষুধার্ত। কয়েকটা রোযা রেখেছেন সেহরী, ইফতার না করে। এমন সময় মক্কা শরীফের রাস্তায় দুই হাজার আশরাফী পেয়েছেন। দুই হাজার আশরাফী মানে এখন মনে কর পাঁচ কোটি টাকা। পেয়ে হঠাৎ করে ধরে ফেলেছেন। ধরার পর এখন তো রাখা যায় না। এখন তো মালিকের কাছে পৌঁছাতে হবে। যদি না ধরা হত তাহলে ঠিক ছিল। ঘরে নিয়ে গেলেন। স্ত্রীও ভালো মানুষ, কিন্তু কতক্ষণ। বললেন, এক কাজ করো না, একটা-দুইটা দীনার আমরা খরচ করি। পরে মালিক পেলে বলব আমরা খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। তোমার মাল তোমার কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করেছিলাম। কিন্তু একটা-দুইটা আশরাফী আমরা খরচ করে ফেলেছি। বুযুর্গ বললেন, ছিয়াশি বছর আল্লাহর হুকুম পালন করে এখন কবরে যাওয়ার সময় আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করব?!

তো মুখতাছার কথা হল এই কঠিন অবস্থাতেও কেন তিনি খরচ করলেন না? কারণ তিনি ভেবেছিলেন, এটা করলে ক্ষতি, যত কষ্টই হোক, অন্যের সম্পদ না ধরলেই লাভ! আরেকজন তো ছিনিয়ে নিচ্ছে, চুরি করে নিচ্ছে। দু’জনই কিন্তু লাভ চায় এবং ক্ষতি থেকে বাঁচতে চায়। তাই লাভের ক্ষেত্র কোনটি তা আমাদেরকে নির্ধারণ করা দরকার। আল্লাহর হুকুম মানার মধ্যেই লাভ। আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করার মধ্যেই ক্ষতি। তবে আল্লাহ তো বড় মেহেরবান। বান্দা শয়তানের ফেরেবে পড়ে, নফসের ধোঁকায় পড়ে গুনাহ করে ফেলে, লাভের পথ থেকে দূরে সরে যায়। তো আল্লাহ বান্দার জন্য ফিরে আসার রাস্তা রেখেছেন-তওবা কর, ইস্তিগফার কর, আল্লাহ মাফ করে দেবেন।

বান্দার হক হলে সেই হকটা আদায় কর, তার কাছে মাফ চাও। আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দেবেন। বান্দার হক আদায়ের চেষ্টা করেছ, কিন্তু আদায় করতে পারনি তো আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, আমি তোমার পক্ষ থেকে সেই হক আদায় করে দেব। কত বড় মেহেরবান আল্লাহ! তো লাভের পথে চলতে চেষ্টা কর। আমরা তো লাভের জন্য এসেছি। ইলমে দ্বীন হাসিল করার জন্য এসেছি। কিন্তু অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না ইলম আসার পথ কোনটা? এই কথাটা বলার জন্যই বসেছি। যেটা ইলম আসার পথ নয়, অনেক সময় আমরা সেটাকে ইলম আসার পথ মনে করে মেহনত করতে থাকি। আর যত মেহনত করি তত ইলম থেকে দূরে সরি। কত বড় দুর্ভাগ্যের কথা। আর যে পথে ইলম আসার কথা ঐটাকে ইলমের পথ মনে না করে ছেড়ে দেই। ঐ পথ থেকে দূরে সরে যাই। এ জন্য এইগুলো আসলে বেশি জানা দরকার। শুধু কিতাব পড়া ও বিভিন্ন মা’লুমাত হাসিল করা, ইলম আসার পথ নয়।

ইলম আসার আসল পথ কোনটা, এটা বুঝা দরকার। তো ইলম আসার পথ অনেক। ইলম না আসার পথও অনেক। ইলম আসার সবচেয়ে বড় পথ হল ‘খিদমতে খালক’ মানুষের খিদমত করা। যে তালিবে ইলম আল্লাহর মাখলুকের বিশেষ করে, ইনসানের, বিশেষ করে মুমিন বান্দার খেদমত করবে তার জান-মালের হেফাযত করবে, ইযযত-আবরুর হেফাযত করবে তার জন্য ইলমের রাজপথ খুলে যাবে। দেখ, আমাদের অনেকেরই এই অভ্যাস আছে, অন্তত এতটুকু আমরা করেই ফেলি যে, কারো একটা দোষ দেখলে অন্যের কাছে বলে দেই। এটা ইজ্জতের ক্ষতি। অথচ যার দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয়, মানুষের মনে কষ্ট জাগে, পশু-পাখির মনে কষ্ট জাগে, কুকুর-বিড়ালের মনে কষ্ট জাগে, তার জন্য ইলমের সবকটা দরজা বন্ধ। আমরা মনে করছি, কিতাবের মধ্যেই ইলম। আসলে তা নয়। ইলম আসলে কলবের মধ্যে। আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে ইলম ঢালেন। আগের যুগেও ঢেলেছেন, খায়রুল কুরূনেও ঢেলেছেন।

সর্বপ্রথম তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কলবে ইলম ঢেলেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সোহবতের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের কলবে ইলম ঢেলেছেন। এভাবে প্রতি যুগে মুমিন বান্দার কলবে আল্লাহ তাআলা ইলম ঢেলেছেন। এটা এ যুগেও অব্যাহত রয়েছে। তবে এ যুগে এযুগের মতো করে ঢালা হয়। আগামীতে তোমরা যারা খেদমতের দায়িত্ব নেবে তোমাদের কলবেও আল্লাহ তাআলা ইলম ঢালবেন। কিতাবের পাতা থেকে ইলম আসবে না। আল্লাহ তোমার কলবে ইলম ঢালবেন। হাদীসের কথা শুনোনি, 

এটা আল্লাহ তাআলা কখন ঢালবেন? অনেকগুলো আসবাব আছে, এর মধ্যে একটা বড় জিনিস হল খিদমতে খালক। মানুষের খেদমত করা। পশু-পাখির খেদমত করা। কাউকে কষ্ট না দেওয়া। এই যে, দেওবন্দ মাদরাসার মুফতিয়ে আযম,  মুফতী আযীযুর রহমান সাহেব। ১০-১২ খন্ডে তার ফতোয়ার কিতাব আছে। পুরো হিন্দুস্তানের মধ্যে তাকে মুফতীয়ে আযম বলা হত। এলাকায় কয়েকজন বিধবা ছিলেন, তাদের বাজার-সদাই করার মতো কেউ ছিল না। তিনি দেওবন্দ মাদরাসায় যখন রওনা দিতেন, তখন তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে বলতেন, তোমার কী সদাই লাগবে বল। আমি বাজারে যাচ্ছি। কল্পনা করতে পার, তার শত শত তালিবুল ইলম ছিল। কাউকে বললেই হত। কিন্তু তিনি ভেবেছেন যে, অন্যকে দেব কেন? এটা তো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত। আমি এই সৌভাগ্য নেব না কেন। তিনি বিধবাদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের বাজার-সদাই করে দিতেন। দীর্ঘদিন তিনি এই খেদমত করেছেন। তিনি কি শুধু কিতাব পড়ে মুফতীয়ে আযম হয়েছেন? কিতাব তো আরো কতজন পড়েছে? তিনি মুফতী আযম হয়েছেন খিদমতের দ্বারা। এটা অনেক বড় বিষয়। তাঁর মতো না পার তোমার সঙ্গে যে তালিবুল ইলম আছে, যে পড়া পারে না, তাকে পড়াটা একটু বুঝিয়ে দাও। এই নিয়তে যে, সে আল্লাহর বান্দা, তার খেদমত করলে আল্লাহ তাআলা আমাকে ইলম দান করবেন। এদ্দুরও না পার অন্তত সে পড়া না পারলে তুমি যে বিরক্ত হও, তা হয়ো না। হুজুর তাকে বুঝাচ্ছেন, তুমি বুঝে ফেলেছো। এজন্য তুমি বিরক্ত হচ্ছ যে, এর কারণে পড়া আরো বিলম্ব হচ্ছে। তুমি বিরক্ত হয়ো না। নিয়ত কর, তাকে বুঝানোর জন্য হুজুর সময় ব্যয় করছেন। আমার সময়টাও ব্যয় হচ্ছে। আল্লাহ তুমি বরকত দান কর। আরেকটা কথা সব সময় বলি। হুজুর কিভাবে বুঝান এটাও শিখতে থাক। এতক্ষণ কিতাবের তাআল্লুম করেছ। এখন তা’লীমের তাআল্লুম কর। একজন না বুঝলে উস্তাদ তাকে কিভাবে বুঝান এই কৌশলগুলো শেখার চেষ্টা কর। যাক, এটা তো যাহেরী সববের কথা। আমি তো বাতেনী সববের কথা বলছি যে, তুমি বিরক্ত  না হলে সহপাঠীর খিদমত হল। এতটুকু খেদমত কর। সহপাঠী ভুল করেছে। এমন একটা ভুল, যা তার করার কথা না। এক সঙ্গে চার-পাঁচজন, দশ-বারজন হেসে উঠলে। এগুলো তো হয়। এটা করে কেন তাকে অপ্রস্ত্তত করছ! তাকে কেন লজ্জিত করছ? বরং শোকর আদায় কর। আল্লাহ, তুমি আমাকে তাওফীক না দিলে আমি বুঝতাম না। আল্লাহ! তুমি আমার এই ভাইকেও তাওফীক দাও। দেখ, তোমার দুনিয়া কীভাবে বদলে যায়। তোমার ইলমের রাস্তা কীভাবে খুলে যায়। এইগুলো হল ইলম আসার পথ। কিন্তু মানুষ এইগুলোকে ইলম আসার পথ মনে করে না। অথচ যদি এই রাস্তাগুলি মানুষ অবলম্বন করে। তখন এক ঘণ্টা কিতাব পড়লে হাজার ঘণ্টার ফায়দা হবে। এটা তো শরীয়তের মেযাজ।

অল্প মেহনতে বেশি দান করা। শরীয়ত বেশি মেহনত চায় না। শরীয়ত চায় মেহনত অল্প হোক, কিন্তু তা যেন হয় আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য। তখন এক ঘণ্টার ইলম চর্চা এক হাজার ঘণ্টার ইলম চর্চার সমান হবে। এক হাজার ঘণ্টা কি কেউ পড়তে পারে? আমি মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে হিসাব দেই। এই যে, আততরীক ইলাল আরাবিয়্যাহ পড়ছ, কুদূরী পড়ছ, হেদায়া পড়ছ। আসলে কয় ঘণ্টা পড়ছ। সারা বছরে কয় ঘণ্টা পড়? এই কয়েক ঘণ্টায় ফিকহের মতো শাস্ত্র, এত বড় একটা ইলম কি এসে যেতে পারে? কোনোভাবেই পারে না। হেদায়া যদি প্রতিদিন এক ঘণ্টা পড়ি, আর না হয় আরো এক ঘণ্টা তাকরার ধরি। তাহলে দুইশ চল্লিশ ঘণ্টা হবে। মাত্র দুই শত চল্লিশ ঘণ্টা পড়ে এত বড় ইলম হাসিল হয়ে যাবে! দুইশ চল্লিশ ঘণ্টা মানে দশ দিন। তো দশ দিন পড়ে তোমার ইলমুল ফিকহ হাসিল হয়ে যাবে। কিছুতেই নয়। হ্যাঁ, যদি এই দশ দিনকে, দুইশ চল্লিশ ঘণ্টাকে আল্লাহ যদি দুই হাজার চারশ ঘণ্টা করে দেন। তাহলে ইলম হাসিল হবে। কিন্তু আমরা তো দুইশ চল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে দুই ঘণ্টারও বরকত পাই না। দুইশ চল্লিশ ঘণ্টা কিতাব নিয়ে বসে থাকি, কিন্তু বদ আমলির কারণে দুই ঘণ্টারও বরকত পাই না। আর আমাদের পূর্ববর্তীরা দুইশ চল্লিশ ঘণ্টা পড়ে দুই হাজার চারশ ঘণ্টার বরকত পেতেন। বরকত পেতেন কোন পথে? বরকত পেতেন এই খিদমতে খালকের পথে। মানুষের খেদমত কর। দেওবন্দের মুফতী আযমের মতো খেদমত যদি করতে না পর অন্তত কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাক। এই যে হাদীস শরীফে আছে, ভালো কথা বল, অথবা চুপ থাক। চুপ থাকাও সদকা। তো তুমি তোমার সহপাঠীকে কষ্ট দিও না। তার জিনিস না বলে নিয়ো না। অন্য জায়গায় রেখে দিও না। কটু কথা বলো না। নিজে বেশি জায়গা নিয়ে তার জায়গাটা সংকুচিত করে দিয়ো না। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো যদি তোমরা করতে পার তাহলে তোমাদের জন্য ইলমের রাজপথ খুলে যাবে। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফীক দান করেন। আমীন। আমার নিজের জীবনেও কিছু ঘটনা আছে। ভয়ে বলছি না। আল্লাহ তাআলা আমাকে যা কিছু দান করেছেন, আমার মনে হয়-কিছু পশু-পাখি ও কিছু গরীব মানুষের দুআর বরকতে দিয়েছেন। এটা আমার বিশ্বাস।

আর মা-বাবার দুআ, আসাতিযায়ে কেরামের দুআ সে তো অন্য মওযূ। আমি মনে করি, কোনো যাহেরী সবব যদি থেকে থাকে তাহলে ঐগুলির দ্বারা আল্লাহ তাআলা সে সবগুলো দান করেছেন।

গরীব মানুষকে কেউ ‘আপনি’ করে বলে না। ‘তুমি’ আর ‘তুই’ করে বলে। তাদেরকে ‘আপনি’ বলার, তাদেরকে ইজ্জত করার কিছু বরকত আছে। তারা যদি কখনো বেইজ্জতি করে, তাহলে ঐ বেইজ্জতির উপর সবর করার মধ্যেও বরকত আছে। কী জান? কারণ সবাই ওদের চেয়ে শক্তিশালী। ওরা কারো কাছ থেকে ইজ্জত পায়ই না। সবার কাছ থেকে বেইজ্জতি পেতে থাকে। তো ওরা যখন ওদের চেয়ে নিরীহ কাউকে পায় তখন ইচ্ছে হয় প্রতিশোধ নেওয়ার। এটা ফিতরতে ইনসানী। মানুষের স্বভাব। তাই কোনো হুজুর পেলে দুর্ব্যবহার করে সুখ পেতে চায়। তার মনে এ ধরনের ভাবনার উদয় হয় যে, সবাই আমাকে তুই-তুকারি করে তা নয়। আমিও কাউকে তুই তুকারি করতে পারি। তো তুমি এসবক্ষেত্রে সবর কর। আল্লাহর বান্দাকে একটু খুশি হতে দাও। আমি তোমাদেরকে ইলমের রাস্তা দেখাচ্ছি। দুনিয়ার মানুষ  এগুলিকে ইলমের রাস্তা মনে করে না। এবং এগুলি থেকে দূরে থাকে।

তালিবে ইলম কি মানুষের সাথে ঝগড়া করতে পারে? সে তো মানুষের দুর্ব্যবহারে সবর করবে। এটা তার ইলম আসার রাস্তা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো জানের দুশমনকেও মাফ করে দিয়েছেন। এই রাস্তা বাদ দিয়ে তুমি কোন রাস্তায়ই ইলম হাসিল করবে? তোমাকে ঐ রাস্তায়ই ইলম হাসিল করতে হবে। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাওফীক দান করেন।

শেষকথা

এশার আগে আল্লাহর এক বান্দার একটু উপকার করেছিলাম। আল্লাহ উপকার করার তাওফীক দিয়েছেন। আবার উপকারের পুরস্কারও দিয়েছেন। হঠাৎ করে কিতাব খুলেছি। কিতাব খুলেই একটি উর্দূ কবিতা পেলাম। কবিতাটা পড়ে আমার ভিতরে একটা ঢেউ উঠেছে। এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম সেগুলো ঐ কবিতারই মাযমূন। কবি বলেছেন-

সবাই তো লাভ চায়। ক্ষতি থেকে বাঁচতে চায়। সবাই মনে করে যে, অন্যকে যত ঠকাতে পারি ততই আমার লাভ। আর নিজে যত ঠকি ততই আমর ক্ষতি। সুতরাং আমি যেন না ঠকি। অন্যকে যেন ঠকাতে পারি। যারা নিজের ক্ষতি করে অন্যের লাভ করে, সবাই তাদেরকে বলে পাগল। তো কবি বলেছেন যে, আমি এই ‘দরসে জুনূন’ গ্রহণ করেছি। লাভ-ক্ষতির এই পৃথিবীতে আমি পাগল হওয়ার শিক্ষা নিয়েছি। সেই শিক্ষাটা কী?

নিজের যত ক্ষতি হয় হোক, কিন্তু অন্যের ক্ষতি যেন না হয়। এতেই আমার লাভ। এটা যদি করতে পারি তাহলেই আমি লাভবান। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন। ষ

অনুলিখন : মাওলানা মামুন

One thought on “ইলম অর্জনের পথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *